পরিযায়ী পাখি দেখতে জাহাঙ্গীরনগরে একদিন

গত সপ্তাহে কাজের ভীষণ রকম চাপ গিয়েছে। আর প্রতিদিন সেই সকাল আটটায় বাসা থেকে বেড়িয়ে নিত্য দিনের যন্ত্রণা যানজট সহ্য করে অফিসে যেতে হয়। আবার অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় আসতে আসতে রাত নয়টা । তখন আর নিজেকে আর পরিবার কে সময় দেয়ার জন্য কোন সময়ই হাতে থাকে না। তাই শুক্র আর শনিবার দিনটি আমার কাছে সোনার হরিণের মত। প্রতি সপ্তাহের শুরুর দিন অপেক্ষা করতে থাকি কবে শুক্রবার আসবে আর একটু হাপ ছেঁড়ে বাঁচবো।
যাইহোক, ঘড়ির কাটা ঘুরে ঘুরে আবার এসেছে বৃহস্পতিবার। আগামী কাল কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় এই নিয়ে ভাবছি। আর বেশি দূরে কোথাও যাওয়া ও যাবে না, কারণ মাসের শেষ তাই পকেট ও হালকা। কথা হচ্ছিল আমার সহ-ধর্মিণী সানন্দা গুপ্তের সাথে কোথায় যাওয়া যেতে পারে বল তো। আর বেশী দূরে ও যাওয়া যাবে না কাছে পিঠে যেতে হবে। তখন ও বলল আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘুরে আসতে পারি ।
শীতের আগমন ঘটেছে বেশ কিছুদিন হতে চললো জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় গেলে পরে অতিথি পাখির দেখা পাবো আমরা। সবুজ প্রকৃতির মাঝে নির্মল এক স্থান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। শীতের শুরু থেকেই জাবি ক্যাম্পাস অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে থাকে। মনে মনে ভাবলাম মন্দ হয় না। কাছের দূরত্ব আর অনেক কিছু দেখতে পারবো। রাতে ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে শুয়ে পড়লাম সকাল সকাল উঠতে হবে নতুন গন্তব্য পথে যাবার জন্য।
সানন্দার ডাকাডাকির চোটে ঘুম থেকে উঠতে হলো। চোখ মেলে তাকাতে সানন্দার প্রশ্ন, কয়টা বাজে এখন জানো তুমি ? আমি জানলার দিকে তাকিয়ে দেখি সূর্য দেবের আভা এতোটা প্রকাশিত না তার মানে খুব একটা বেলা হয় নাই। আমি বললাম কয়টা হবে আর সকাল সাত টা হবে আর কি। বলতেই সানন্দা বললো ঘড়ির দিকে তাকাও একবার। ঘড়ির দিকে তাকাতেই আমার চোখ মাথায় ওঠার যোগার ঘড়ির কাঁটায় সকাল এগারোটা বাজি বাজি। আমি বললাম, ক্যামনে কি হলো আমি অ্যালার্ম দিয়ে রাখলাম কিন্তু … সানন্দা বলে উঠলো আর ভাবতে হবে না দ্রুত তৈরি হয়ে নেও। আমি আর দেরী না করে প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম নতুন গন্তব্যে যাবার জন্য।
বারোটার দিকে আমরা আমাদের ডেরা থেকে বের হলাম গন্তব্য পানে যাবার জন্য। বাসা থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়ে আছি রিক্সার জন্য গুলিস্তান যাবো বলে সেখান থেকে বাসে করে যেতে হবে সাভারে। কিন্তু কোন রিক্সার দেখা নাই বেশ কিছু সময় পর একজন তিন চাকার মহাজনের দেখা পেলাম। তাকে বলে রাজি করালাম গুলিস্তান নিয়ে যাবার জন্য। আমি , সানন্দা আর অনিক তিন জন উঠলাম এক রিক্সায়। একটু কষ্ট হচ্ছিল এক রিক্সায় যেতে কিন্তু কিছুই করার নাই। আমরা পৌঁছলাম গুলিস্তান গিয়েই পেলাম একটি বাস সাভারে যাবে যাত্রী জন্য ডাকা ডাকি করছে আমরা চেপে বসলাম বাসে।
পনেরো থেকে বিশ মিনিটের ভেতর বাস ছাড়লো গন্তব্য পানে। নগর জীবনের কোলাহল পেড়িয়ে চলছে এগিয়ে আমাদের চার চাকার বাস। মিরপুর , ধানমন্ডি, ফুলবাড়ি হয়ে এগিয়ে চলছে। মাঝে মাঝে রাস্তায় জ্যাম যাত্রা পথকে দীর্ঘায়ত করছে। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা এসে পৌঁছলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রধান ফটকে। বাস থেকে নেমেই নিয়ে নিলাম তিন চাকার মানব ভ্যান অতিথি পাখি দেখতে যাবো বলে।
উত্তরের হাওয়া বলে দিচ্ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শীতের প্রকোপ ভালোই পড়েছে। আমরা চলছি এগিয়ে, এক অনিন্দ প্রাকৃতিক আবহের ভেতর দিয়ে। দেখা পেলাম জলাশয়ে অসংখ্য পদ্ম ফুটে রয়েছে। আমাদের ভ্যানের পাইলট বললেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২টির মতো জলাশয় আছে। এর মধ্যে পাখির আনাগোনা বেশি প্রশাসনিক ভবনের সামনে ও পেছনের দুটি জলাশয়, জাহানারা ইমাম হল, প্রীতিলতা হল এবং আল বেরুনী হল সংলগ্ন জলাশয়ে। সবগুলো জলাশয়ে আছে লাল শাপলা। দিনের প্রথম ভাগে শাপলারা ফুটন্ত থাকে। লাল শাপলার এ গালিচার মাঝে অতিথি পাখিদের আনাগোনাও যে কারোর মন ভালো করে দিবে।
বর্তমানে ক্যাম্পাসের জলাশয়ে হাঁস-পাখি ‘পাতি সরালি’র প্রাধান্যই বেশি। এছাড়া মাঝে মাঝে দেখা মিলবে ছোট পানকৌড়ি, ধলাবুক ডাহুক কিংবা পাতি পানমুরগির। আমরা দেখতে চলে এলাম প্রশাসনিক ভবনের সামনে। নেমেই দেখতে পেলাম অতিথি পাখিরা নির্ভাবনায় মেতে উঠেছে খোঁশ গল্প আর জলকেলিতে। কেউবা আবার ডুব সাঁতারে ব্যস্ত। লেকের কোথাও তারা জুটিবদ্ধভাবে নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। আবার কখনও তারা চক্রাকারে চিৎকার করে উড়ে বেড়াচ্ছে ক্যাম্পাসের মুক্ত আকাশজুড়ে।
অতিথি পাখির কলকাকলি আর কিচিরমিচির শব্দে এক মধুময় সুরের আবহ বিরাজ করছে। আমি ছবি তুলতে লাগলাম একের পর এক। এদিকে অনিক বলে উঠলো সে কুলফি খেতে চায়, তার মতে শীতের মধ্যে ঠাণ্ডা খেতে মজা বেশী। আমি বিক্রেতাকে বললাম আমাদের তিন জনকে কুলফি দেন, বলতেই প্রত্যুতরে বিক্রেতা বলে উঠলেন তিন রকমের কুলফি স্পেশালটা দিবো নাকি। আমি বললাম খাবো যেহেতু স্পেশালটাই দেন। অনিক এর কথাই ঠিক শীতের মিষ্টি হাওয়ার মধ্যে ঠাণ্ডা কুলফি খাওয়ার মজাই আলাদা। কুলফি খেয়ে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম সামনের দিকে।
দেখা হলো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিথুন এর সাথে, ও বললো প্রতি বছর উত্তরের শীতপ্রধান দেশ সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, সিনচিয়াং ও ভারত থেকে হাজার হাজার অতিথি পাখি দক্ষিণ এশিয়ার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশে আসা পাখিদের ৮-৯ শতাংশ এই ক্যাম্পাসে আসে। মূলত অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বরের প্রথম দিকেই এরা এ দেশে আসতে শুরু করে। মার্চের শেষ দিকে তারা আপন ঠিকানায় ফিরে যায়।
বাংলাদেশের মানুষ শখ করে যাযাবর এসব পাখিকে ডাকে গেস্ট বার্ড/মাইগ্রেটরি বার্ড বা অতিথি পাখি। অসম্ভব বন্ধু-সুলভ এই পাখিগুলোর অনেকটাই আমাদের দেশি হাঁস প্রজাতির। এই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোতে প্রায় ৫০ প্রজাতির অসংখ্য পাখির আগমন ঘটেছে। এদের বেশিরভাগই হাঁস জাতীয় ও পানিতে বসবাস করে। এর মধ্যে সরালি, পচার্ড, ফ্লাইফেচার, গার্গেনী, ছোট জিরিয়া, মুরগ্যাধি, কোম্বডাক ও পাতারি অন্যতম। এছাড়া মানিক জোড়, কলাই, ছোট নগ, জলপিপি, নাকতা, খঞ্জনা, চিতাটুপি, লাল গুড়গুটি প্রভৃতি পাখি এদেশে অতিথি হয়ে আসে প্রতি বছর। অবিরাম তুষারপাতে এবং তীব্র শীতের কারণে ওইসব অঞ্চলে বসবাসরত পাখিরা হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে চলে আসে।
এখানে ছোট-বড় প্রায় ২২টি লেক থাকলেও পাখিরা ক্যাম্পাসের হাতেগোনা মাত্র দুতিনটি লেকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তাদের আবাসস্থান হিসেবে গড়ে তোলে। আমাদের মত অনেকেই এসেছেন পরিযায়ী পাখি দেখতে। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম, এদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো পেটে তেমন কিছুই দেয়া হয় নাই। সানন্দা বলে উঠলো চলো এবার বটতলার দিকে যাই সেখানে গেলে শত পদের ভর্তা দিয়ে দুপুরের পেট পূজাটা সেরে নেই। যেই বলা সেই কাজ, আমরা পদব্রজে বটতলা পানে এগিয়ে যেতে লাগলাম। স্বল্প সময়ে পৌঁছে গেলাম বটতলায়, মানুষের সমাগম বেশ প্রতিটি খাবারের দোকানে। একটিতে ঢুকে পড়লাম আমরা কিন্তু কোন আসন খালি না থাকায় কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হল আমাদের।
শেষ পর্যন্ত আমাদের আসনের ব্যবস্থা হল। বসতেই আমাদের সামনে হরেক রকমের ভর্তা হাজির করা হল সিম ভর্তা, বেগুন ভর্তা, আলু ভর্তা, টমেটো ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, গাজরের ভর্তা ,পুদিনা পাতা ভর্তা, কালোজিরা ভর্তা আর কতো কি সব গুলোর নাম ও মনে নাই। যাইহোক, প্রায় আট রকমের ভর্তা দিয়েই দুপুরের ভূরি ভোজ শেষ করলাম আমরা। ভোজন পর্ব শেষ করে এগিয়ে গেলাম আমরা সামনের দিকে সেখানে দেখা পেলাম মিষ্টি পান নিয়ে বসেছেন বিক্রেতা আমাদের ভ্রমণ সঙ্গী অনিক মিষ্টি পান খেতে চায় তাই তার জন্য মিষ্টি পান নেয়া হলো।
এরপর সানন্দা বলে উঠলো, প্রান্তিক মোড়ের পাশের মাঠে বাজার বসে কাপড়ের সেখানে চলো যাই। ঐ জায়গায় ভালো কাপড় পাওয়া যায়, আর দামেও সস্তা। আমরা গেলাম প্রান্তিক মোড়ের পাশের মাঠে সেখানে দেখা পেলাম মানুষের ভীরে জমজমাট বাজার। সানন্দা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো প্রতিটি দোকান । দেখতে দেখতে সময় পেড়িয়ে গেলো যে কীভাবে আমরা টেরই পেলাম না। প্রকৃতির সান্নিধ্যে সারাটি বেলা কটিয়ে এবার বিদায় নেবার পালা আমরা ফিরে চললাম নাগরিক যন্ত্রণার শহরে।
কখন যাবেন :
মূলত অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বরের প্রথম দিকেই অতিথি পাখিরা বাংলাদেশে আসে। আবার মার্চের শেষ দিকে ফিরে যায় আপন ঠিকানায়। ক্যাম্পাসে পাখি দেখার সবচেয়ে ভালো সময় শীতের সকাল এবং বিকেল। তাই খুব সকালে গিয়ে সারাদিন কাটাতে পারেন ক্যাম্পাসে। দুপুরে খেয়ে নিতে পারেন ক্যাম্পাসের বটতলা খ্যাত বিভিন্ন রেস্তোরাঁয়। খুব কম দামে হরেক পদের ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাবার সারতে পারবেন।
যেভাবে যাবেন :
ঢাকার গুলিস্তান, ফার্মগেট, কল্যাণপুর কিংবা গাবতলি থেকে নবীনগর, মানিকগঞ্জ-গামী যে কোনো বাসে চড়ে সহজেই নেমে যেতে পারবেন ক্যাম্পাসের সামনে। ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার জন্য সহজ বাহন তিন চাকার ভ্যান গাড়ি অথবা রিকশা।

সুমন্ত গুপ্ত 

Comments